আপনি সময় নিন ধৈর্য ধরুন আপনারও সময় আসবে। ধৈর্য সবকিছু জয় করে


প্রায় সময়ই আমরা ভাবি আমার সঙ্গেই কেন এমনটা হতে হলো অথবা কখনো জীবনে এত পেয়ে যাই যে আমরা অহংকারী হয়ে পড়ি। জীবনের সব চাওয়া-পাওয়াতেই আমরা ভুলে যাই এসবই আমাদের সৃষ্টিকর্তার লেখা। আমরা ভুলে যাই তার পরিকল্পনা দিনশেষে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ সেটা সময়ই বলে দেয়। আপনি হয়তো এখন কোন খারাপ সময় পার করছেন অথবা হয়তো সাময়িক সুখে মত্ত হয়েভ ভবিষ্যৎ ভুলে বসে আছেন তাহলে এই গল্পটা আপনার জন্যই। এই গল্পটি শুধু আপনাকে ভাবাবে না আপনাকে বদলেও দিবে। তাই গল্পটা শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

একসময় সবুজে ঘেরা এক পাহাড়ের কোলে ঘন জঙ্গলের পাশেই ছিল ছোট্ট একটি গ্রাম। সেই গ্রামে বাস করতেন এক সাধারণ মানুষ। নাম তার আবু চাচা। মধ্যবয়সী আবু চাচার জীবন ছিল সাদামাটা। অভাব অনটন নিত্যসঙ্গী। দুবেলা দু মুঠো খেয়ে বাঁচাই ছিল যেন তার কাছে অনেক কিছু। কিন্তু এই দারিদ্রের মধ্যেও একটা জিনিস ছিল যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করত। তিনি সবসময় নিজের যা আছে তাতেই খুশি থাকতেন। অভিযোগ করতেন না। আবু চাচার ছিল ছোট্ট এক টুকরো জমি। সেই জমিতেই তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলাতেন। আর এই কাজে তাকে সাহায্য করত তার একমাত্র ছেলে রাকিব এবং এক সাদা শক্তিশালী ঘোড়া। এই ঘোড়াটার নাম ছিল জেরি। জেরি কিন্তু আর দশটা ঘোড়ার মতো ছিল না। সে ছিল ভীষণ বুদ্ধিমান, কর্মঠো আর চটপটে।

মাঠের সব কাজে সে এমনভাবে সাহায্য করত যে আবু চাচা আর রাকিব দুজনেই জেরিকে প্রচন্ড ভালোবাসতো। জেরি যেন তাদের পরিবারেরই একজন সদস্য। একদিন জেরির এই অসাধারণ সৌন্দর্য আর বুদ্ধিমত্তার কথা গিয়ে পৌঁছালো শহরের এক বড় ব্যবসায়ীর কানে। তার নাম সালাম সাহেব। তিনি নিজের ছেলেকে নিয়ে একদিন গ্রামে এলেন জেরিকে দেখতে। জেরিকে দেখে সালাম সাহেব রীতিমত মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি আবু চাচার কাছে মোটা অংকের টাকা দিয়ে জেরিকে কেনার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু আপনারা বিশ্বাস করবেন না আবু চাচা এত বড় একটা প্রস্তাব বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিলেন। শুনে অনেকেই অবাক হলো। অনেকে তাকে বোকাও ভাবলো। গ্রামের লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো। আবু চাচা কি বোকা রে বাবা এত বড় সুযোগ হাতে পেয়েও ফিরিয়ে দিল।

এই গরিব মানুষটা কত টাকা পেত এরপর কি হলো জানেন? কয়েকদিন পরেই এক ঘটনা ঘটলো যা শুনে গ্রামের সবাই আরো জোরে হাসাহাসি শুরু করে দিল। হঠাৎ একদিন দেখা গেল জেরি তার আস্তাবল থেকে উধাও। আবু চাচার রাকিব সারাদিন খুঁজেও জেরির কোন সন্ধান পেল না। এবার গ্রামের লোকেরা যেন আরো সুযোগ পেয়ে গেল। তারা মুখ টিপে হাসতে হাসতে বলতে লাগলো। এই তো হলো এত দামি ঘোড়া রাখার যোগ্যই না আবু চাচা। কেউ কেউ আবার বলল নিশ্চয়ই সালাম সাহেবের লোকেরাই চেরিদিকে চুরি করে নিয়ে গেছে। রাকিবের মনটা সেদিন খুব খারাপ হয়ে গেল। সে বাবাকে জিজ্ঞাসা করল বাবা এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল তুমি এত শান্ত কেন? আবু চাচা শুধু মুচকি হেসে বললেন, সবকিছুতেই ভালো আর মন্দ লুকিয়ে থাকে বাবা। এত চিন্তা করিস না।

আবু চাচার কথাগুলো রাকিব ঠিক বুঝতে পারলো না। সে ভাবল বাবা হয়তো কষ্ট পেয়েছেন কিন্তু বাইরে দেখাচ্ছেন না। কিন্তু কিছুদিন পর এক সকালে মাঠে কাজ করতে করতে তারা এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখল। জেরি ফিরে এসেছে। আর সে একা আসেনি তার সাথে নিয়ে এসেছে আরো পাঁচটা বুনো ঘোড়া। এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামে হইচই পড়ে গেল। যারা আগে হাসাহাসি করছিল তারা এবার রীতিমতো চমকে গেল। তারা বলতে লাগলো আবু চাচার তো কপাল খুলে গেল। কি ভাগ্যবান লোক। আবু চাচা শুধু হাসি মুখে বললেন, জেরি হয়তো জঙ্গলে গিয়ে নিজের দল খুঁজেছে। এখন সবাইকে নিয়ে ফিরেছে। সবাই আবু চাচাকে ভাগ্যবান বলে ডাকতে লাগলো। কিন্তু রাকিব একটা জিনিস খেয়াল করল। এত বড় আনন্দের ঘটনাতেও তার বাবা আগের মতোই শান্ত। তার মুখে কোন অহংকার বা অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস নেই।

এরপর রাকিব প্রতিদিন সেই বুনো ঘোড়াগুলোকে প্রশিক্ষণ দিতে লাগলো। ঘোড়াগুলোকে পোষ মানানো, পিঠে চড়ানো, মালপত্র টানানো সবকিছু সে যত্ন করে শেখাতে লাগলো। কিন্তু কয়দিন পরেই ঘটলো এক দুঃখজনক ঘটনা। একদিন একটা ঘোড়া রাকিবকে ছিটকে ফেলে দিল, আর তার পা ভেঙে গেল। গ্রামবাসীরা আবার শুরু করল কানাগুশা। এই ঘোড়াগুলোর কারণেই তো আজ ছেলের পা ভাঙলো। আবু চাচা বুঝলো না কত বড় বিপদ ডেকে আনলেন। রাকিব কষ্ট নিয়ে আবার বাবাকে বলল, বাবা, এবার তো সত্যিই খারাপ কিছু হয়েছে। আবু চাচা আবারও শান্তভাবে বললেন, ভালো বা খারাপ এটা এক মুহূর্ত দেখে বলা যায় না বাবা। সময় সবকিছু বুঝিয়ে দেবে। রাকিব সেদিনও বাবার কথার অর্থ পুরোটা বুঝতে পারলো না। তার পা ভাঙ্গার কষ্ট তাকে ঘিরে ধরেছিল।

কিন্তু এর পরের সপ্তাহেই ঘটলো এক অভাবনীয় ঘটনা। দেশে হঠাৎ করে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হলো যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামের সব যুবককে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু একটা সুবিধা হলো রাকিবকে নেওয়া হলো না। কারণ তার পা ভাঙ্গা। যারা যুদ্ধে গিয়েছিল তাদের অনেকেই আর ফিরে আসেনি। গ্রামের বাতাসে শুধু কান্নার শব্দ। অনেক গ্রামবাসী আবু চাচার কাছে এসে কানতে কানতে বলতে লাগলো আবু চাচা আপনি কত ভাগ্যবান আপনার ছেলে বেঁচে গেল আর আমরা আমাদের সন্তানদের হারালাম তখন আবু চাচা রাকিবের পাশে বসলেন এক গভীর প্রশান্তি নিয়ে তিনি বললেন দেখো রাকিব জীবনে যা ঘটে তা কখনো সরল নয় জেরিকে হারানোটা শুরুতে খারাপ মনে হয়েছিল তাই না কিন্তু সে ফিরে এলো আরো পাঁচটা ঘোড়া নিয়ে আবার তোর পা ভাঙ্গাটাও খারাপ লেগেছিল তাই না?

কিন্তু সেটাই তোকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিল। আবু চাচার কথাগুলো যেন রাকিবের চোখে নতুন করে সবকিছু খুলে দিল। আবু চাচা আরো বললেন, তাই জীবনে ভালো কিছু হলে খুব বেশি উল্লাসিত হওয়ার দরকার নেই। আর খারাপ কিছু হলে হতাশ হয়ে ভেঙে পড়বি না। সবকিছুর সময়ের ব্যাপার। আসল শিক্ষাটা হলো ভালো হোক বা খারাপ সবই একসময় কেটে যাবে। জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটা ঘটনা সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না। ভালো বা খারাপ তা সময়ই বলে দেয়। রব আমাদের জন্য কি রেখেছেন সেটা আমরা এখন না বুঝলেও একদিন ঠিক বুঝবো। তাই প্রতিটা পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরুন। কৃতজ্ঞ থাকুন। আর বিশ্বাস রাখুন সবকিছুই একটা উদ্দেশ্য নিয়ে ঘটে। আপনার জীবনেও হয়তো এমন কিছু ঘটছে যেটার মানে এখন স্পষ্ট না। কিন্তু বিশ্বাস করুন রবের পরিকল্পনা সবসময় আপনার ভালোর দিকেই। মনে রাখবেন এই কথাটা ভালো বা খারাপ সবই একদিন কেটে যাবে। কঠিন সময়ে ভেঙে পড়বেন না। আর সুখে আত্মহারা হবেন না। সবকিছুর মধ্যেই একটা ভারসাম্য থাকে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Thank's for visiting me!

X