রাতে ঘুম আসে না? একটু প্রশান্তির ঘুমের সন্ধান!


প্রারম্ভিকতা

অনেক রাত হয়ে গিয়েছে…
ঘুমাতে গিয়েছিলেন অবশ্য কাজের কাজ শেষ করে বিছানাতে রাত ১১ টা কিংবা ১১:৩০ অথবা বড়জোর ১২:০০ টার সময় – কিন্তু ঘুম আসছে না; এমনকি জোর করে চোখ বন্ধ করেও কাজের কাজ ঘুম আসছে না। ঐদিকে ঘুম তো আসছেই না উপরন্তু এমনি এমনি শুয়ে থাকতেও অসহ্য লাগছে, তাইনা?!

সে তাই হউক আর নাই হউক – ঘুম না আসলে বিরক্ত লাগা স্বাভাবিক তেমনি আপনি নিজেই যে আপনার ঘুম নষ্ট করার কারন এটাও সত্য!

ঘুমের টাইম ডিউরেশান

(১) স্বাভাবিকভাবে বয়সের সাথে সাথে ঘুমের ব্যাপ্তির পরিমান আপনার ঠিক নেই। যেমন নবজাতক (০–৩ মাস) ১৪–১৭ ঘণ্টা ঘুম ঘুম / শিশু (৪–১১ মাস) ১২–১৬ ঘণ্টা ঘুম ঘুম / টডলার বা ছোট শিশু (১–২ বছর) ১১–১৪ ঘণ্টা ঘুম / প্রি-স্কুল শিশু (৩–৫ বছর)
১০–১৩ ঘণ্টা ঘুম / স্কুল বয়সী শিশু (৬–১২ বছর)
৯–১২ ঘণ্টা ঘুম / কিশোর (১৩–১৮ বছর)
৮–১০ ঘণ্টা ঘুম / প্রাপ্তবয়স্ক (১৮–৬৪ বছর)
৭–৯ ঘণ্টা ঘুম / বয়স্ক (৬৫ বছর ও তার বেশি)
৬–৮ ঘণ্টা ঘুম এই আদর্শ নিয়মের কতোটুকু আপনি পালন করেন?

(২) যদিও উপরের টাইম ডিউরেশান ঠিকও থাকে তবে সেই ঘুমের সময় অর্থাৎ কখন হতে আপনার ঘুম শুরু আর কখন শেষ সেই আইডিয়েন্টিফিকেশনাল ইন্ডিকেটর কি আদৌ ঠিক আছে? আপনার জন্য ৮ ঘন্টা ঘুম পূরণ করলেও হয়তো সেই ঘুমের শুরু করছেন রাত দুইটা – আড়াইটায় আর শেষ করছেন বেলা ১০ টা কিংবা ১১ টা বাজে; অবশ্যি কারোর কারোর সেটা বেলা ১২ বাজলেও ঘুম ভাঙ্গে না – ঐদিকে তাতে হিউম্যান বায়োলজিক্যাল ক্লকের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছেন তাতেও হুশ আসে না!

(৩) এই যে ঘুমের সমস্যা সেটা কবে হতে শুরু হয়েছে? নাহ মানে, আপনার ঘুমের এই যে অনিয়ম সেটা কতোদিন বা মাস কিংবা বছর হয়ে চললো সেটারও তো খেয়াল নেই – তাহলে যেটাকে আপনার মস্তিষ্কের অভ্যাসেই পরিণত করেছেন সেটাতেও আবার রাতে ঘুম না আসলে মেজাজ খারাপ করার মানে আছে নাকি?

ঘুম এবং আপনি!

আমার মেজাজ আমি খারাপ করবো – তুমি বলার কে রে ভাই? ঠিক যেমন করে আপনি ভাবেন যে “ঘুমানো কিংবা রাত জেগে থাকা একান্তই আপনার স্বাধীনতা” কিন্তু আপনার শরীরের ভেতর যে বিবর্তনীয়ভাবে একটা নিউরো কেমিক্যালে গড়া ফিজিক্যাল প্রোপার্টির রুটিন আছে সেটা তো আপনি মানতে বাধ্য – যখনই সেটা আপনি ভেঙ্গে ফেলছেন তখন তাতে সহজাত প্রতিক্রিয়া হবে এটাও স্বাভাবিক।
আপনি ভাবছেন “রাতে কাজ করলে অনেক প্রোডাক্টিভিটি আসে” এটা মিথ্যা নয় – কিন্তু ভাইরে ভাই আপনি নিজে কি আদতে এমন প্রোডাক্টিভ কিছু করেন? নাহ, করেন না – তাহলে কেমনে দোহায় টানেন যে আপনার ঘুমটাও কোয়ালিটিফুল হবে?
বিষয়টা আপনাকে ব্লেইম দেওয়া না দেওয়ার নয় বরং একজন মানুষ আসলেই প্রোডাক্টিভ কাজ করে অনেক রাতে ঘুমুতে গেলে তার মস্তিষ্কের যে অবস্থা থাকে আর আপনার অযাচিত কারনে স্ক্রিনিং টাইমে কাটিয়ে দেওয়া সময়ে মস্তিষ্কের স্থিতি দুটো তো সমান নয় সুতরাং আপনি চাইলেও আপনার ঘুম ঐ আপনার দুই চোখে ভর করতে নিতান্তপক্ষে বাধ্য নয়।
শরীরের মাঝের বায়োলজিক্যাল ক্লক বাদ রেখেও যদি বিচার করা হয় তাহলে সাধারণ মানুষের ঘুমে যতোটা স্ট্রেস রিলিফ করিয়ে নতুন দিনের জন্য স্ট্যামিনা সঞ্চয় হবে সেটা আপনার মস্তিষ্কে আসবে না কেননা আপনি ঘাড়ত্যাড়া হলেও আপনার মস্তিষ্ক হতে হরমোন নিঃসরণ করতে সঠিক লজিক প্রয়োজন।
আপনার ঘুম না আসার দায় একান্তই আপনার – আবার সেই ঘুমটাতে আনার দায়িত্বও আপনার সুতরাং ঘুমের ওপর রাগ না করে আপনার মনের কমপ্লেক্স রোগ দূর করে নিয়মানুবর্তী হউন; আশা করা যায় দ্রুতই মস্তিষ্ক সেটা ক্যাচ করে ফিডব্যাক দিবে।

ঘুম ক্যানো আসে না?

আচ্ছা হইছে রে বাপু হইছে – কিন্তু ঘুম কেন আসে না সেটার কারনটা কি?
নিউরোকেমিক্যাল দিক হতে বিশ্লেষণ করলে মেলাটোনিনের ঘাটতি যা কিনা আসলে ঘুমের এক কার্যকরী হরমোন সেটাই তো আপনি দিনের বেলা ঘুমিয়ে প্রাকৃতিকভাবে সূর্যের আলোর হতে উৎপন্ন হওয়ার উপায় ব্লক করে দিয়েছেন – কোন শখে আপনার সুখের ঘুম আশা করেন?
অন্যদিকে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনে যে শারিরীক ও মানসিক অস্বস্তি তাতেও ঘুমের দফারফা হয়ে যায় – কোথায় ঘুমিয়ে একটু রিলাক্স হবেন তা নয় তো উপরন্তু ঘুম না আসার কারনেই বরং অসহ্য অনুভূতি নিয়ে অবশিষ্ট রাতটুকু পার করতে হয়।
অন্যদিকে অ্যাড্রেনালাইন ও নোরঅ্যাড্রেনালিন কেন বাদ যাবে বলুন – তারাও আপনার ঐ ইট্টুখানি আনন্দ পাওয়ার লোভে যে স্ক্রিনিং টাইম কাটান তাতে চিন্তা আর উদ্দীপনার সাথে সাথে উত্তেজনার ঠেলায় মস্তিষ্ক হতে ভুলভাল ইম্পালসিভ সিগন্যাল জেনারেট করে – সুতরাং ঘুমের জন্য আদর্শ এনভায়রনমেন্ট’টাই তৈরী হতে পারে না।
অন্যদিকে যদি কেবল সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশন বিবেচনা করা হয় তাতে স্ট্রেস (Stress), উদ্বেগ (Anxiety), ডিপ্রেশন (Depression), PTSD (Post-Traumatic Stress Disorder) এর মতো বিষয়গুলো থাকে, তাতে মস্তিষ্ক যদি একান্তই শাম্ত হতে না পারে তবে কিভাবে ঘুমটা আসবে বলুন?

ঘুমের ঔষধে খেলে ঘুম আসে না?

তাহলে কি এমন করা যায় যাতে তবুও অন্তত ঘুম আসবে?
হ্যা, ঘুমের ঔষধ একটা কার্যকরী উপায় বটে [সাইকিয়াট্রিস্ট এর পরামর্শ ছাড়া কখনোই কোন প্রকার সাইকোজেনিক ঔষধ সেবন করা উচিত নয় তথাপি যদি সাইকোলজিক্যাল কারনেও ঔষধ সেবন করতে হয় তবুও সেটা সাইকিয়াট্রিস্ট এর প্রেসক্রাইব অনুসারেই হতে হবে]; কিন্তু ঘুমের ঔষধের ওপর নির্ভর করেও আপনার শরীর একটা সময় তা রেজিস্টেন্স করে ফেলবে যখন হয়তো ঘুমের ঔষধেও ঘুম আসবে না – উপরন্তু প্রায় সকল ঘুমের ঔষধ আসলে নানান সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডারের সাথে রিলেটেড হওয়ায় যখন (১) কেবলমাত্র ঘুমের জন্যই ঔষধের ওপর নির্ভর করে আছেন তাতে অন্যান্য সহজাত সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশনাল ডিজঅর্ডার উঁকি দিবে এবং (২) যখন আপনার মস্তিষ্ক ঐসব ঘুমের ঔষধেও রেজিস্টেন্স তৈরী করে ফেলছে তখন আনুষাঙ্গিক সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশনাল ডিজঅর্ডারের উপসর্গ তো বটেই সাথে সাথে ঔষধে ক্রিয়া না ঘটায় যেসব প্রতিক্রিয়া থাকে সেগুলোও আপনার দেহ মনে বাসা বাঁধবে।
এনিওয়্যে একটি কথা তো জানানো হয়নি…মেডিক্যালি এমন একক কোন ঔষধ নেই যা কিনা শুধুমাত্র ঘুমের জন্যই ডেডিকেটেড আর তাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে না – তবুও যদি পিল খেলে নিজেকে কিল করতে চান তবে আর ঘুমানোর সাধ করে লাভ কি?!

শান্তির ঘুমের সন্ধান

এইতো লাইনে আসছেন – আপনি একটুখানি শান্তির ঘুম খুঁজছেন আর অন্যদিকে ঘুমটাই আসলে শরীর মনে প্রশান্তির উপায় তবে সেইসবের জন্য সবার আগে আপনাকে তো শান্ত হতে হবে নাকি?
আপনি শান্ত হউন >>> আপনার মস্তিষ্ক হতে যতোসব দুঃশ্চিতা আর দূর্ভাবনা সেগুলো দূরীভূত করার চেষ্টা করুন। হ্যা, মস্তিষ্ক কখনোই চিন্তাশূন্য থাকে না তথাপি অযাচিত চিন্তা ভাবনাগুলো যথাসম্ভব
এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন এবং শরীর মনে নির্ভার হউন >>> খুব জোর করে চোখ বন্ধ করে থাকতে হবে এমন নয় তবে আলতো করে চোখ পাতা স্বাভাবিকভাবে বন্ধ রাখতে পারেন >>> নিশ্চল হতে ঘুম আসবে এমন ইচ্ছাতে সময় যাপন করুন >>> পূর্বোক্ত টাস্ক ফলো করলেও হয়তো আদতে আপনার খুব সহজেই ২/৩ রাত ঘুম আসবে না [এই যে এতোদিনের অভ্যাস সেটা তো রাতারাতি বদলে যাবে না বরং আপনার এই মানসিক প্রয়াসটাকে শরীরকে শিখিয়ে পড়িয়ে অভ্যস্থ করতে আপনাকে কিছুদিন সময় দিতে হবে]। যদি ঘুম নাও আসে তবুও আপনি একইভাবে বিছনাতে থাকবেন যতোক্ষণ না অবধি সম্পূর্ণভাবে ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছেন >>> সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে আপনার জন্য প্রযোজ্য হয় এমন ঘুমের টাইম ডিউরেশান অনুসারে এলার্ম সেট করুন এবং সেই একই এলার্মে কোনরূপ অলসতা না করে উঠে বিছানা হতে উঠে পড়ুন >>> সকালবেলা হালকা ব্যায়াম করতে বা জগিং করতে বের হউন যেন ভোর বেলার নির্মল পরিবেশ আপনাকে ছুয়ে যায় >>> সারাদিনে আপনার দৈনন্দিন কাজসমূহের পাশাপাশি সূর্যের আলো শরীরে প্রবেশ করানোর জন্য ১০/১৫ মিনিট সময় ব্যায় করুন [দুপুরে গোছলের আগে একটি ভালো চয়েজ হতে পারে] >>> নিয়মিত আহার মেইনটেইন করুন এবং অযাচিত ঝাল ও চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করুন [শুনতে একটু অবাক লাগলেও সত্য পেটে খাবার হজমে সমস্যা থাকলে রাতে ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটে] >>> সারাদিনে শরীরে নূন্যতম ক্যালারি খরচ করুন অর্থাৎ দেহ মনে পরিশ্রম হবে এমন কাজ করুন; এটা যেমন হতে পারে শরীরে খেটে পরিশ্রম তেমনি সুষ্ঠ মানসিকতার জন্য বই পড়তে পারেন >>> অযাচিত ডোপামিন ট্রিপ করা হতে বিরত থাকুন যেমন ঘন্টার পর ঘন্টা স্ক্রিনে রিলস দেখার পরিবর্তে একটা সুন্দর মুভি বরং অধিক শ্রেয়, অযাচিত গেইমের থেকে পরিবার বা প্রিয়জনের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলুন ইত্যাদি >>> সম্ভব হলে শুধুমাত্র রাতে ঘুমানোর সময়’ই কেবলমাত্র বিছানা ব্যবহার করুন – বিছানা দেখলেই গা এলিয়ে শুয়ে অহেতুক সময় যাপন করবেন না, টেবিল বা চেয়ার কিংবা সোফা আরামের জন্য ব্যবহার করুন – বিছানাতে শরীর লেপ্টে না দিয়ে >>> সন্ধ্যার পর কফি বা ক্যাফেইনের মতো উপাদান যা উদ্দীপনা জাগায় সেইসব পরিহার করুন >>> রাতে লাইট খাবার শেষ করে টুথ ব্রাশ ও রিফ্রেশ হয়ে ঘুমাতে যাবেন, কোলাহল পরিহার করে কেবলমাত্র ঘুমের জন্যই আপনার ডেডিকেশান আপনাকে দিনে দিনে প্রশান্তির ঘুম নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে >>> উপরোক্ত বিষয়গুলো একদিন বা দুইদিন করেই যদি ঘুম নাও আসে তবুও নিয়মিত ফলোআপ এবং মেইনটেইন করবেন – যতোদিন না অবধি দেহমনে প্রশান্তির ঘুম গেইন হচ্ছে, এমনকি সুন্দরভাবে চলমান ঘুমের এই প্রক্রিয়া অব্যহত রাখতে একই লাইফ রুটিন প্র্যাকটিস নিশ্চিত করবেন।

কনক্লুশন

একটুখানি শান্তির ঘুমের জন্য কত্তো কিছু তাইনা? নাহ গো, এই একটুখানি প্রশান্তির ঘুম’ই আপনার সারাদিনের যাবতীয় কাজকর্ম এর হ্যাপি লাইফ লীড করতে মস্তিষ্কের রিস্টার্ট ফাংশান; সুতরাং একটি সুখী জীবন পেতে ঐ একটুখানি প্রশান্তির ঘুম’ই যে বড্ড প্রয়োজন।
শুভকামনা রইলো
টেলিগ্রাম আমন্ত্রণ রইলো OpenEye

 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Thank's for visiting me!

X