আসসালামু আলাইকুম।
যদি আপনি চিন্তা করে দেখেন, যেকোন স্মার্টফোনই কিন্তু অসম্ভব শক্তিশালী একটা ডিভাইস, এবং একদম কম বাজেটেরও একটা স্মার্টফোনে কী কী করা যায় এই তালিকা করে আমরা শেষ করতে পারবো না। তো স্মার্টফোনের বেলায় আমরা সেই জায়গাটায় পৌঁছে গেছি, যখন স্মার্টফোনগুলোর পার্থক্যগুলো অনেক বেশি কাগজে-কলমের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
হ্যা, সময়ের সাথে সামগ্রিক মার্কেট ট্রেন্ডে কিছু কিছু নতুনত্ব আসে। যেমন বর্তমানে আমরা বাজেট ফোনেও IP রেটিং ও ডিউরেবিলিটিকে গুরুত্ব দিতে দেখছি এবং তিন-চার বছর আগের ফোন থেকে এখনকার স্মার্টফোনগুলোর তফাৎ যথেষ্ট-ই পাওয়া যাবে।
তবে তার বাইরে নির্দিষ্ট ধরণের অডিয়েন্সকে নিয়ে কাজ করা কিংবা ব্র্যান্ডগুলোর নিজস্বতা প্রতিষ্ঠা করা এই জায়গাগুলো মার্কেটে প্রায় অনুপস্থিত। ডিজাইনে আইফোনের অনুকরণের বাইরে যেতে না পারা, সব ফোনেই সমানভাবে বড় ডিসপ্লে দিয়ে যাওয়া এরকম দিকগুলো স্মার্টফোনের বৈচিত্রকে আরো কমিয়ে দিয়েছে।
তো যাইহোক, হেলিও-র পক্ষ থেকে 15 হাজার টাকায় মার্কেটে নতুন একটি স্মার্টফোন এসেছে- Helio 55। বরাবরের মতই খুব আলাদা কিছু ট্রাই না করলেও এই বাজেটে আমরা যে ফিচারগুলোর চেকলিস্ট তৈরি করতে পারি, তার প্রায় সবগুলো এই স্মার্টফোনটি পূরণ করে। FHD+ রেজ্যুলেশন, ডিসপ্লে প্রোটেকশন, ডুয়াল স্পিকার, নয়েজ ক্যানসেলেশন মাইক, IP64 ওয়াটার এন্ড ডাস্ট রেজিস্টেন্স, জাইরোস্কোপ ও কম্পাস সেন্সর এরকম খুঁটিনাটি দিকগুলো আমরা অনেক সময়ই বাজেটে একসাথে পাই না, তো এটাই আমার কাছে এই স্মার্টফোনের আকর্ষণীয় দিক।
এই লেখাটি শুধুমাত্র স্মার্টফোনটিতে কী কী থাকছে তার পর্যালোচনা ও সামগ্রিক একটি ওভারভিউ। আমি স্মার্টফোনটি ব্যবহার করিনি। কাজেই, এই লেখা বাস্তব এক্সপ্রেরিয়েন্সের পুরোপুরি ধারণা দিবে না।
ডিজাইন ও এক্সটেরিয়র

ছবি ও ভিডিও যেগুলো দেখলাম, Helio 55 এর শাইনি ব্যাকপার্ট ও ক্যামেরা মডিউল মিলিয়ে দেখতে খুব সুন্দর ও প্রিমিয়াম দেখায়। ফোনটির তিনটি কালার ভ্যারিয়েন্টের নাম দেয়া হয়েছে- Graphite Black, Metallic Silver ও Silk Green এবং প্রতিটিই সুন্দর।
কিন্তু সত্যি বলতে আমি যদি একটা বাজেট স্মার্টফোন কিনি, আমি চাইবো না আমার ফোনটা গরিবের আইফোন ভাব দেয়ার চেষ্টা করুক। প্রত্যেকের একটা নিজস্বতা থাকা উচিৎ। এতদিন আগের আইফোনের ডিজাইন ফলো করে এসেছে বাজেট স্মার্টফোনগুলো। যেই আইফোন ১৭ প্রো ডিজাইনে একটা চেঞ্জ আনলো, এখন তারা আবার সেই ডিজাইন অনুকরণ করতে শুরু করেছে। বিষয়টা দুঃখজনক।

ওপরে-নিচে ডুয়াল স্পিকার থাকছে ফোনটিতে। নিচে প্রাইমারি মাইকের সাথে ওপরে সেকেন্ডারি নয়েজ ক্যান্সেলেশন মাইকও দেয়া হয়েছে। থাকছে টাইপ সি চার্জিং পোর্ট ও 3.5 mm হেডফোন জ্যাক। ডানদিকে পাওয়ার ও ভলিউম বাটনস থাকছে। বামদিকে কার্ড স্লটে দুটি ন্যানো সিম ও একটি মাইক্রো এসডি কার্ড সাপোর্ট করে। সেইসাথে আরেকটি কাস্টমাইজেবল একশন কী থাকছে।

ফোনটির থিকনেস 8.55 mm এবং ওজন 200 g এর কাছাকাছি।
ওয়েবসাইটের উল্লেখ অনুযায়ী ফোনের বক্সে হ্যান্ডসেট, চার্জার ও কাগজপত্রের পাশাপাশি একটি ব্যাক কভার এবং একটি ইয়ারফোন-ও পেয়ে যাবেন।
ডিসপ্লে
Helio 55-এর ডিসপ্লে একটি 6.78″-এর IPS প্যানেল, যার রেজ্যুলেশন FHD+ (1080×2460) এবং পিক্সেল ডেনসিটি 397 ppi। 91.55% স্ক্রিন টু বডি রেশিওর সাথে ডিসপ্লেটিতে থাকছে সেলফি ক্যামেরার জন্য পাঞ্চহোল কাটআউট। আউটডোরে সর্বোচ্চ 650 nits পর্যন্ত ব্রাইটনেস অর্জন করতে সক্ষম এই ডিসপ্লেটি।
ডিউরেবিলিটি ও আইপি রেটিং
হেলিও বিশেষভাবে হাইলাইট করেছে Helio 55-এর ডিউরেবিলিটির দিকটি। ডিসপ্লে প্রোটেকশন, ডায়ামন্ড-শেইপড কর্নার এবং ভেতরে এভিয়েশন মেটাল স্ট্রাকচার ও এন্টি-কলিশন বিম এরকম দিকগুলো স্ক্র্যাচ ও ড্রপের কেইসগুলোতে ফোনটাকে একটা বাড়তি সুরক্ষা দিবে। ফোনটার ব্যাকপার্ট প্লাস্টিক বিল্ট, PMMA ম্যাটেরিয়াল।

ডিসপ্লে প্রোটেকশন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে IronGuard Glass (Panda Screen)। IronGuard Glass শব্দটা বোধহয় হেলিও-ই ব্যবহার করে, এটা নিয়ে অন্য কোথাও কিছু পেলাম না। যাইহোক, পান্ডা গ্লাস চাইনিজ একটি প্রোটেকশন গ্লাস, যেটা গরিলা গ্লাসের সুলভ একটি বিকল্প। হেলিওর ওয়েবসাইটে এর 8H হার্ডনেসকে Mohs স্কেল হার্ডনেস বলা হয়েছে, যেটা সম্ভবত মিসলিডিং। যতটুকু অনলাইন ঘেঁটে বুঝলাম 8H, 9H প্রভৃতি পেনসিল হার্ডনেস স্কেলের মান প্রকাশ করে।
যাইহোক, এই বাজেটে একটা প্রোটেকশন থাকছে এটাই মূল কথা, তবে সাথে এটা ভালোমানের টেম্পার্ড গ্লাস ব্যবহার করাটা সবসময়ই ভালো প্রাক্টিস।
ফোনটাতে IP64 এর ডাস্ট ও ওয়াটার রেজিস্টেন্স থাকছে, যেখানে 6 সম্পূর্ণ ডাস্ট রেজিস্টেন্স ও 4 যেকোন দিক থেকে পানির স্প্ল্যাশ থেকে সুরক্ষা নির্দেশ করে। হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিতে সুরক্ষার জন্য এটা নির্ভরযোগ্য, তবে খুব ভারি বৃষ্টি বা পানিতে চুবানোর জন্য IP64 যথেষ্ট না।
পারফর্মেন্স ও স্টোরেজ
Mediatek Helio G92 চিপসেট নিয়ে এসেছে Helio 55। মিডিয়াটেক আসলে দুইদিন পরপর প্রায় একই প্রসেসর নতুন নতুন নাম দিয়ে আনে, এই আরকি। G85, G88, G91, G92 এগুলো সবই মূলত একই জিনিস, বা অত্যন্ত সামান্য তফাৎ।
2.0 GHz পর্যন্ত ক্লকস্পিডের A75 সিরিজের দুটি পারফর্মেন্স কোর, এবং 1.8 GHz পর্যন্ত ক্লকস্পিডের A55 সিরিজের ছয়টি কোর থাকছে এখানে। গ্রাফিক্স প্রসেসর হিসেবে থাকছে সর্বোচ্চ 1 GHz ফ্রিকুয়েন্সির Mali-G52 MC2।
ফোনটি 8 GB র্যাম ও 128 GB স্টোরেজ এই একটি ভ্যারিয়েন্টেই রিলিজ হয়েছে। এটা মাইক্রোএসডি কার্ড দিয়ে 512 GB পর্যন্ত স্টোরেজ এক্সপানশন সাপোর্ট করে।
G92 বা সিমিলার চিপসেটগুলোর একটি লিমিটেশন হলো এখানে স্টোরেজ টাইপ eMMC 5.1 পর্যন্ত সমর্থিত, ফলে স্টোরেজ রিড-রাইটের সাথে সম্পর্কিত অপারেশনগুলোর স্পিডে UFS স্টোরেজের ফোনগুলো থেকে সাইড বাই সাইড একটু পিছিয়ে থাকবে।
ক্যামেরা
50 MP মেইন ক্যামেরার অ্যাপার্চার f/1.8 এবং মার্কেট ট্রেন্ড ও আইফোনের অনুকরণ ঠিক রাখতে দেয়া বাকি দুটো লেন্সের একটি 2 MP ম্যাক্রো লেন্স। সেলফি ক্যামেরা 32 MP এর f/2.0 অ্যাপার্চারের একটি সেন্সর।

মেইন ক্যামেরাতে EIS আছে, যেটা ভিডিও ক্যাপচারের সময় কিছুটা স্ট্যাবলিটি দিবে। ফ্রন্ট ও মেইন দুটো ক্যামেরাতেই 1080p পর্যন্ত রেজ্যুলেশনে ভিডিও ক্যাপচার করা যায়। জুম শুধুমাত্র 4x পর্যন্ত। এখানে ডুয়াল ভিউ (ফ্রন্ট ও রেয়ার ক্যামেরা একসাথে) রেকর্ডিং সাপোর্ট এবং প্রো মোড ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ছবি বা ভিডিওর কোয়ালিটি কেমন হবে এটা নিয়ে অবশ্য রিয়েল লাইফ এক্সপ্রেরিয়েন্স ছাড়া মন্তব্যের সুযোগ নেই।
সফটওয়্যার ও একশন কী
Helio 55 এসেছে Android 15 এর সাথে। ইউটিউব ব্যাকগ্রাউন্ড প্লে-ব্যাক, স্ক্রিন রেকর্ডার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট অ্যাপ্লিকেশন লক, হিডেন অ্যাপস, সাইড অ্যাপ্লিকেশন বার, কালার টেম্পারেচার কাস্টমাইজেশন ফিচারগুলো থাকছে।
ফোনটিতে বাম দিকে সিম ট্রে-র নিচে একটি একশন কী আছে যার সিঙ্গেল ক্লিক, ডাবল ক্লিক ও লং প্রেসে সাইলেন্ট মোড টগল, স্ক্রিনশট এরকম কিছু একশন বা কোন অ্যাপ্লিকেশন ওপেন সেট করতে পারবেন।

ব্যাটারী, সেন্সর ও অন্যান্য
6000 mAh ব্যাটারীর সাথে 18 W চার্জিং সমর্থন আছে। ব্যাটারী ফুল চার্জ করতে ২:৩০ ঘন্টার আশেপাশে লাগবে। এই বাজেটে এখন আমরা আরো ফাস্ট চার্জিংও দেখছি। সেখানে 18 W একটু কম দেখাতে পারে, তবে এটা গুড এনাফ।
সেন্সরের মধ্যে দরকারি সবগুলো সেন্সর থাকছে- এক্সেলেরোমিটার, গ্রাভিটি, প্রক্সিমিটি, লাইট, জাইরোস্কোপ ও ম্যাগনেটোমিটার। সাইড মাউন্টেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর এবং ফেস আনলক আছে। আগেই বলা হয়েছে যে ডুয়াল স্পিকার এবং নয়েজ ক্যানসেলেশন মাইকও রয়েছে ফোনটিতে।
তো এই ছিলো Helio 55 এর সামগ্রিক ওভারভিউ। ১৫ হাজার টাকা বাজেটের মধ্যে ফিচারের দিক থেকে বেশ পরিপূর্ণ একটা ব্যালেন্সড স্মার্টফোন।
একটি নিয়নবাতি পরিবেশনা
দেখতে পারেন: ভার্চুয়াল র্যাম: স্মার্টফোন কেনার আগে যেটুকু জানা প্রয়োজন
