১৬ হাজার টাকায় দ্রুতগতির ও রিলায়েবল মাল্টিফাংশন প্রিন্টার Brother DCP-T220 (রিফিল Ink Tank, স্ক্যানার+প্রিন্টার)


আসসালামু আলাইকুম।

Brother DCP-T220 প্রিন্টারটা ব্যবহার করছি বছরখানেকের ওপরে, এবং রিভিউ লেখাও শুরু করেছিলাম অনেক মাস আগে, কিন্তু কেন যেন অনেক বেশি সময় লাগিয়েও লেখা আগাচ্ছিলো না। যাই হোক, এটা কিনেছিলাম কয়েকজন মিলে, যদিও এখন আমার একার মালিকানায় নিয়ে নিয়েছি। তো এই প্রিন্টারটা যেধরণের ব্যবহারের জন্য তৈরি, তার থেকে বলা যায় নিয়মিত অনেক বেশিই প্রিন্ট হয়েছে এতে। সব মিলিয়ে প্রিন্টারটা কেমন সার্ভিস দিয়েছে তা নিয়ে কথা বলবো এখানে।

DCP-T220 এর বর্তমান বাজারমূল্য ১৬ হাজার টাকার আশেপাশে। আমরা যখন কিনেছিলাম তখন ১৬৫০০ টাকার মত লেগেছিলো বোধহয়। স্ক্যান, প্রিন্ট ও ফটোকপি- তিনটি ফাংশন থাকছে প্রিন্টারটিতে। এটা রিফিল Ink Tank ফাংশনালিটিসহ একটি কালার (CMYK) ইঙ্কজেট প্রিন্টার। রঙিন বা সাদাকালো দু’ধরণের প্রিন্ট-ই করতে পারবেন।

অন্যদিকে কমতির মধ্যে প্রিন্টারটিতে Wi-Fi কানেক্টিভিটি নেই, শুধুমাত্র USB কানেকশন। লিনাক্স, উইন্ডোজ ও ম্যাক ওএস সাপোর্ট করলেও অ্যান্ড্রয়েড থেকে প্রিন্ট করা যায় না। অটোমেটিক ডুপ্লেক্স প্রিন্টিং সমর্থন নেই, এবং পেপার ট্রে-র ডিজাইনের কারণে টু-সাইডেড প্রিন্টিং একটা পিওর পেইন।

বেশিরভাগ সময় লিনাক্স থেকে প্রিন্টারটা ব্যবহার করেছি। লিনাক্সে ড্রাইভার ইন্সটল করে নেয়ার পর প্রিন্ট ও স্ক্যান দুটি ফাংশনই যথাযথভাবে কাজ করেছে। উইন্ডোজে বাড়তি কিছু গ্রাফিকাল ইউটিলিটি আছে, যেমন- Brother iPrint&Scan বা প্রিন্টিং প্রিফারেন্স প্রভৃতি।

প্রিন্টের কোয়ালিটি ও গতি

এই বাজেটে Brother DCP-T220 প্রিন্টের সবচেয়ে দ্রুতগতির প্রিন্টারগুলোর মধ্যে থাকবে। Epson বা Canon এর এই রেঞ্জের ইঙ্কজেট প্রিন্টারগুলো থেকে গতি চোখে পড়ার মত দ্রুত।

প্রিন্টের গতি ডায়নামিকভাবে এডজাস্ট করে। সাদাকালো প্রিন্টিং খুবই দ্রুত হয়। কালার প্রিন্টিংয়ের ক্ষেত্রে পেজের সাদাকালো অংশগুলো দ্রুত প্রিন্ট হয়। আবার কোন জায়গা খালি থাকলে সে অংশটুকু দ্রুত স্কিপ হয়। তো প্রিন্টে কতক্ষণ সময় লাগবে নির্ভর করছে পেজের কনটেন্টের ওপর। তবে সাধারণ টেক্সটসহ পেজ সাদাকালো আর কালার যথাক্রমে ৫ ও ১০ সেকেন্ডের আশেপাশে সময়ে প্রিন্ট করতে পারে।

অন্যদিকে প্রিন্টের কোয়ালিটি Draft, Normal, Fine তিনরকম হয়ে থাকে। Normal কোয়ালিটিতে প্রিন্টের কোয়ালিটি যথেষ্ট ভালো সাধারণ ডকুমেন্ট, বই, স্লাইড প্রভৃতি প্রিন্টের জন্য। Fine কোয়ালিটিতে প্রিন্ট করতে প্রায় আড়াই মিনিটের মত সময় নেয়, তবে সেক্ষেত্রে প্রিন্টের কোয়ালিটিও অনেক সুন্দর হয়। ছবি বা সার্টিফিকেট প্রিন্টের ক্ষেত্রে এটা ইউজফুল। সাধারণ প্রিন্টে A4 কাগজের চারদিকে 3 mm করে একটা এরিয়া আনপ্রিন্টেবল থাকে। পেপার সাইজ অপশনে A4 (Borderless) সেট করলে এই এরিয়াসহ প্রিন্ট হয়, কিন্তু তার জন্য Fine প্রিন্টের মত দীর্ঘ সময় নেয়।

প্রিন্টের পর পেজের সোজা দিকে প্রিন্ট থাকে। তো যদি ১, ২, ৩ এভাবে প্রিন্ট করা হয়, তাহলে শুরুতে প্রিন্ট হওয়া ১ নাম্বার পেজ সবার নিচে চলে যাবে, ৩ নাম্বার পেজ আসবে ওপরে। প্রিন্টিংয়ের সময় Reverse সেট করে দিলে বিপরীত সিরিয়ালে প্রিন্ট হবে, ফলে প্রিন্টের পর যথাযথ সিরিয়ালে থাকবে।

পেপার ট্রে

Brother DCP-T220 তে মেইন পেপার ট্রেতে একসাথে ১৫০ এর মত পেজ দেয়া যায়। ট্রে-টা পুরোপুরি বন্ধ থাকে, পেপার দেয়ার জন্য বারবার খুলতে হয়, এটা বেশ সমস্যা। কারণ আমি দেখা যায় নিজের পড়ার জন্য কোন নোট প্রিন্ট করার সময় হয়ত আগে একদিক ইউজ করা পেজে প্রিন্ট নিচ্ছি, আবার অন্যান্য কিছু প্রিন্ট করতে গেলে ফ্রেশ কাগজে প্রিন্ট দিচ্ছি- তো এরকম সময়ে পেপার পরিবর্তন করার জন্য প্রতিবার পেপার ট্রে খোলাটা বেশ বিরক্তিকর। আবার ভেতরে পেজ আছে কিনা বা কেমন আছে বোঝাও কঠিন হয়।

পেপার ট্রে সাধারণ অবস্থার A4 সাইজের পর্যন্ত পেজ দেয়া যায়। এই পর্যন্ত লিগাল সাইজ প্রিন্ট করার দরকার হয়নি, কিন্তু আমি একটু অবাক হচ্ছিলাম যে সেটা দেয়ার মত অবস্থা কেন থাকবে না। এবং আজকে এই লেখার সময় জানলাম ট্রে-টা আসলে Legal সাইজের পেজ দেয়ার জন্য এক্সটেন্ড করা যায়।

মেইন পেপার ট্রে বাদে আরেকটা ম্যানুয়াল ফিড ট্রে আছে, যেটা মূলত ফটো পেপার বা অন্যান্য বিশেষ ধরণের পেপারের জন্য। এখানে একটা করে পেজ দেয়া যায়। এখানে পেপার থাকলে প্রিন্টার অটোমেটিক এখানকার পেজে প্রিন্ট করবে এরকম। প্রিন্ট হেড ক্লিন ও টেস্ট পেজ বা রিপোর্ট প্রিন্টের সময় এখানে পেজ থাকলে অটোমেটিক ইজেক্ট হওয়ার কথা, কিন্তু তার বাইরেও এই ট্রে-র বিহেভিয়র আমি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি বা মেইন ট্রে-র মত রিলায়েবল পাইনি।

স্ক্যান

DCP-T220 এর স্ক্যানার A4 সাইজ পর্যন্ত পেজ স্ক্যান করতে পারে। একইভাবে স্ক্যানের গতি নির্ভর করবে DPI-এর ওপর। 300 dpi এর ক্ষেত্রে ১২ সেকেন্ড ও 150 dpi এ ৫ সেকেন্ডের মত সময় নেয় টেক্সট স্ক্যান হতে। লিনাক্সে স্ক্যান করার জন্য Gnome-এর ডিফল্ট Document Scanner ব্যবহার করেছি। Flawless ভাবে কাজ করে। DPI, Image, Text সবগুলো সেটিংস এজ এক্সপেক্টেড কাজ করে। উইন্ডোজ ও ম্যাকের জন্য Brother iPrint&Scan ইউটিলিটি আছে।

বাই দা ওয়ে, টেক্সট আর ইমেজ স্ক্যানের পার্থক্যটাও আমি রিভিউ লিখতে গিয়ে প্রথমবারের মত বুঝলাম…

টেক্সট স্ক্যান ও ইমেজ স্ক্যান

রিলায়েবিলিটি

প্রিন্টার ব্যবহারকারীরা জানেন যে কখন কোন কারণে প্রিন্টারের প্রিন্ট করতে মন চায় না- এইটা বুঝে ওঠা বড্ড মুশকিল। প্রিন্ট দিলেই সিমপ্লি প্রিন্ট হবে, এটা বোধহয় শুধু রূপকথাতেই সম্ভব।

প্রিন্টার সিমপ্লি কাজ করবে, এটা শুধু রূপকথার গল্পেই সম্ভব (কালেক্টেড)

Brother DCP-T220 বেশ রিলায়েবল ছিলো সামগ্রিকভাবে- মানে প্রিন্টার হিসেবে আরকি… এখানে এক্সপ্রেরিয়েন্সেরও একটা ফ্যাক্টর আছে যা বুঝলাম। যেমন কানেকশনে সমস্যা, কালি শেষ, পেপার ট্রে ঠিকমত লাগেনি, নাকি কোন কারণে হোল্ড থেকে resume করা দরকার এই বিষয়গুলো বুঝতে পারা আস্তে আস্তে সহজ হয়ে যায়।

একদমই অযাচিত সমস্যা, কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছি না, ড্রাইভার অযথা ঝামেলা করছে এরকম সিনারিও সেভাবে মনে পড়ে না। পেপার আটকে যাওয়া বা এরকম সমস্যাগুলোও খুবই রেয়ারলি হয়েছে। অবশ্য একসাথে একাধিক কাগজ নেয় কখনো কখনো, টু-সাইড প্রিন্ট করতে গেলে এটা সিরিয়াল অগোছালো করে দিতে পারে। এছাড়া ম্যানুয়াল ফিড ট্রে-র বিহেভিয়র রিলায়েবল পাইনি, যেটা আগে বলেছি।

আরেকটা সমস্যার মধ্যে একটানা প্রিন্ট করার ক্ষেত্রে মাঝেমাঝে প্রিন্ট হেড ক্লিন করার দরকার হত। সাধারণত প্রিন্টার অটোমেটিক-ই প্রয়োজনমত এটা করে নেয়ার কথা, কিন্তু মাঝেমাঝে ম্যানুয়ালি ক্লিন দিতে হয়েছে। ম্যানুয়াল বলতে কমান্ড দিয়ে ২-৩ মিনিট অপেক্ষা করা, কিন্তু সমস্যাটা হলো হয়ত ৫০ পেজ প্রিন্ট দিয়ে রেখেছি, হঠাৎ দেখলাম ২৫ পেজের পর থেকে কোন একটা কালি ঠিকমত আসেনাই, তখন আবার প্রিন্ট হেড ক্লিয়ার দিয়ে নতুন করে প্রিন্ট দেয়া লাগছে এরকম একটা ব্যাপার। যেকারণে বেশি পেজ প্রিন্ট দিলে ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা নজরদারিতে রাখা লাগে।

প্রিন্টারের মান্থলি ডিউটি সাইকেল ২৫০০ পেজ। কিন্তু আমাদের অনেকসময়ই আরো বেশি প্রিন্ট করা হয়েছে। একটানা কয়েকশো পেজ প্রিন্ট করা হয়েছে প্রায়ই। এই কারণে সম্ভবত প্রিন্ট হেড ক্লিন দেয়ার প্রয়োজন বেশি হত। তবে নভেম্বর মাসে ভার্সিটি শেষ+বাসা বদল মিলিয়ে প্রিন্টারটা প্যাকেট করা অবস্থায় মাসখানেকের বেশি ব্যবহারের বাইরে ছিলো, ডিসেম্বর মাসে ২০০-র মত পেজ প্রিন্ট হয়েছে। তো এই সময়কালে কখনো ম্যানুয়াল ক্লিন দিতে হয়নি। মাসখানেক পড়ে থাকার কারণেও কোন সমস্যা হয়নি।

প্রিন্টের খরচ (রিফিল ও কাগজ)

প্রিন্টের খরচ হিসেব করলে Brother DCP-T220 প্রিন্টারটা ভালোই সাশ্রয়ী। কালির থেকে কাগজের খরচটাই বেশি। পেপারের ক্ষেত্রে A4 80 GSM পেপার ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় সবসময়। প্রতি পেজ মোটামুটি ৮০ থেকে ৯০ পয়সার মত পড়ে। সব মিলিয়ে এক থেকে দেড় টাকার মত পড়ে প্রতি পেজ প্রিন্টের খরচ।

এর Cyan, Magenta, Yellow ও Black অরিজিনাল রিফিল কালিগুলোর প্রত্যেকটির দাম বর্তমানে ১২০০ টাকা করে। ব্লাক প্রতি রিফিলে এস্টিমেটেড প্রিন্টের সংখ্যা ৬৫০০ পর্যন্ত এবং রঙিন কালির ক্ষেত্রে ৫০০০ পর্যন্ত।

পেজের ৫% জুড়ে কালি থাকবে, এরকম একটা হিসাব করে অবশ্য এই এস্টিমেশন করা হয়, কাজেই ছবি বা গাঢ় ব্যাকগ্রাউন্ড এমন প্রিন্ট করলে তাতে প্রিন্টের সংখ্যা অনেকগুণ কমে যাবে। তো বাস্তবে হয়ত গড়ে বিভিন্ন ধরণের মিলিয়ে ২০০০-৩০০০ পেজের মত প্রিন্ট হয় একবার রিফিল করলে।

কালি রিফিল করাটা একদমই সিম্পল। লিকুইড হিসেবে বোতলে কালিগুলো পাওয়া যায়। ট্যাঙ্কের নির্দিষ্ট কালির ক্যাপ খুলে রিফিল বোতলটা ঠিকঠাকমত বসিয়ে দিতে হয় জাস্ট।

কালি রিফিল করা

আমি এই পর্যন্ত সবসময় অরিজিনাল কালি ব্যবহার করে আসছি। চাইনিজ কালি এর অনেকগুণ কমে পাওয়া যায়, তবে কমদামি কালিগুলো পাতলা ধরণের হয় এবং প্রিন্ট কোয়ালিটি ভালো দিতে পারে না। একইসাথে প্রিন্ট হেডের দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্যও অরিজিনাল কালি ব্যবহার করা সেফ। পেজের ক্ষেত্রে একইভাবে 70 GSM ব্যবহার করলে খরচ কিছুটা কমবে, তবে একসাথে একাধিক পেজ টেনে নেয়া বা পেজ আটকে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

ভার্ডিক্ট

কিছু বাদ পড়লো? পড়লে পড়ুক, ইতোমধ্যেই এই পোস্ট লিখতে অযৌক্তিক রকমের বড় একটা সময় নিয়ে ফেলেছি। তো আমি পার্সোনালি প্রিন্টারটা নিয়ে খুবই স্যাটিস্ফাইড। দ্রুতগতি এবং রিলায়েবিলিটির দিক থেকে Brother DCP-T220 সম্ভবত ১৬ হাজার টাকা বাজেটের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অপশন, অথবা অন্তত সবচেয়ে ভালোগুলোর মধ্যে থাকবে। এছাড়া DCP সিরিজের মধ্যে ওয়ারলেস প্রিন্ট ও অ্যান্ড্রয়েড সাপোর্টসহ DCP-T420W আছে ১৮৫০০ টাকা বাজেটে এবং অটোমেটিক ডুপ্লেক্স প্রিন্টিং সাপোর্টসহ DCP-T530DW আছে ২৩০০০ টাকা বাজেটে।

আরো দেখুন: XP-Pen Deco 01 V3 গ্রাফিক্স ট্যাবলেট: ৩ মাস ব্যবহারের পর রিভিউ

একটি নিয়নবাতি পরিবেশনা


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Thank's for visiting me!

X