
চুরি এবং চাল পড়ার পেছনের সাইকোলজি
আমাদের গ্রাম্য সমাজে অনেক আগে হতেই – এমনকি অদ্যবধি মফস্বল শহুরে সমাজেও একটি বিশেষ বিষয় প্রচলিত আছে যে “কোন কিছু চুরি হলে চাল পড়া খাওয়ানোর রীতি – যাতে চোর ধরা পড়ে”।
তবে আক্ষরিকভাবে মূল প্রশ্ন থাকে যে আসলেই “চাল পড়া খেয়ে কি সত্যিই চোর ধরা পড়ে?”
যদিও এই বিষয়টা ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ হতে স্পর্শকাতর – তবুও আমরা কুসংস্কার এর মিথ বাস্টিং এর মাধ্যমে মূল সত্য তুলে ধরবো কোন ধর্ম বা বিশ্বাসে যথাসময় আঘাত না করেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকায় সাইকোলজিক্যাল এনালাইসিসের মাধ্যমে।
চলুন শুরু করা যাক….
চোর এবং চাল পড়া
সাধারণত গ্রাম্য কিংবা শহুরে মফস্বলি এলাকাতে এখনও এই প্রথা চালু আছে যে কোথাও কিছু চুরি হলে সেখানে চাল পড়া খাওয়ানোর মাধ্যমে চোর’কে শনাক্ত করা যায়। এখানে বিশ্বাস তথা ধর্মগত দিক হতে মুসলিম ধর্মে যে কাজটা করা হয় তা হলো সন্দেহজনক কিছু ব্যক্তিকে একত্রিত করে সেখানে সবাইকে কিছু চাল পড়া খাওয়ানো হয় – তাতে যে বা যিনি চুরি করেছেন সে চাল গিলতে পারবে না। কিছুক্ষেত্রে এমন শোনা যায় যে গলা হতে রক্ত উঠবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
কি দোয়া পড়ে?
এখন যদিও স্পর্শকাতর তবুও আমাদের বিষয়টা ক্ল্যারিফাই হওয়ার জন্য জানা দরকার ঐ চাউল পড়াতে কি কি দোয়া পড়া হয়?
মূলত প্রচলিত সূরা ফাতিহা এরপর লআয়াতুল কুরসি এবং তিন কুল পড়ে ঐ চাউলে ফু দেওয়া হয়।
আরও বিশেষ কিছু দোয়া হয়তো ক্ষেত্রে বিশেষে পড়া হয় তবে এগুলোই প্রচলিত মূল দোয়া [এক্ষেত্রে কারোর এলিবাই থাকলে তিনি মন্তব্যে স্পেসিফিকভাবে কোন দোয়া পড়া হয় জানাতে পারেন – তাতে জাস্টিফিকেশান করা যাবে বৈকি]।
[আর হ্যা, এটাও এখানে উল্লেখ করে নিতে হচ্ছে যে যদিও চাল পড়া সমাজে প্রচলিত তবুও ইসলামে স্বীকৃত রুকাইয়াতে এটির প্রমান নেই]
চাল পড়া সত্যিই কি চোর খেতে পারে না?
এখানেই আসলে মূল ফ্যাক্ট লুকিয়ে আছে – যার উত্তর এবং জট খুলতে সাইকোলজির সহায়তা নিতে হবে।
তারও আগে একটি ক্ল্যারিফিকেশান প্রয়োজন হবে – যাতে সমালোচনা কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া যায় এবং কোনরূপ অযাচিত বিতর্ক তৈরী না হয়…
“আপনি কি এমন কাউকে দেখেছেন যে কিনা চুরি করার ফলে চাল পড়া খেতে পারেননি অথবা তার গলা হতে রক্ত উঠেছে ইত্যাদি?”
এটা কিন্তু অমুকের কাছে শুনে তমুকের শোনাকথায় জাজামেন্ট হতে পারবে না – বরং লজিক এবং এভিডিয়েন্স অনুসারে এটা হতে হবে “চাক্ষুষ প্রমাণ – যার সকল তথ্য ক্রস ভেরিফাই করা যাবে”।
এখন এটাও সত্য যে অনেক সময় আক্ষরিকভাবেই চোর চাউল পড়া খেতে তথা গিলতে পারেন না – ফলে চোর শনাক্ত হয় এবং সহজেই চাউল পড়ার গুণাগুণ জনমনে ছড়িয়ে পড়ে। এটাকে অনেকটাই হিস্টোরিয়ার সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশনে যোগসূত্র মেলে [মূলত হিস্টোরিয়া ডিজিজ’টির একদম শুরুর মূল কিন্তু এক প্রকার ফিমেইল সেক্সুয়াল ফ্রাস্ট্রেশন হতে উদ্ভূত ব্যাধি – সেইদিকে আপাতত না যাই] – যেখানে একটি আচরণত বৈশিষ্ট্য (বিহ্যাবিয়ার সাইকোলজিক্যাল ফ্যাক্ট) ফেনোমেনার মতো অন্য একইরূপ মানসিকতার মানুষের মাঝে সংক্রমণ ঘটায়।
সহজভাবে বললে এই যে “চাল পড়া খেলে চোর ধরা পড়ে” এটি সহজেই মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে মানব মস্তিষ্কের অবচেতন অংশ (সাবকনশিয়াস মাইন্ড) – তে পজেটিভ ভাইবে সেইভ হয়ে থাকে। এটির সাথে জুড়ে থাকে নিউরাল কানেক্টিভিটি ব্রিজে ধর্মীয় বিশ্বাস, আস্থা, ভয় ও ভক্তি এবং সহজাত হিস্টোরিক্যাল বৈশিষ্ট্য যা Functional Neurological Symptom Disorder (সংক্ষেপে Somatoform Disorder) এর সাথে রিলেটিভ।
ঠিক বুঝেও যেন বুঝলাম না….
আচ্ছা প্রতিটি পয়েন্ট স্পষ্টভাবে ডিটেইলস বর্ণনা করা যাক
• ধর্মীয় বিশ্বাস : ধর্মীয় বিশ্বাস যা সহজাতভাবে জন্মগতভাবে আমরা শিশুকাল হতেই শিক্ষা দীক্ষায় বড় হই – সুতরাং এটার প্রভাব আমাদের মস্তিষ্কে সবচেয়ে গাঢ়ভাবে কাজ করে। আমরা ধর্মীয় বিষয়ে সবচেয়ে বেশী সেনসেটিভ হওয়ার ঐ ধর্মের স্থিতিস্থাপকতার জন্যই আমাদের ব্রেইন ইনিশিয়াল ট্রিগার করে সেল্ফ ডিফেন্স মেকানিজমে।
সুতরাং উদাহরণস্বরূপ আপনি চুরি করেছেন < ধর্মীয় বিশ্বাসে চাল পড়ার গুনাগুবলী বিদ্যমান = সুতরাং যদিও আপনি নিজেকে সেইফ করতে চাইবেন তবুও আপনার মস্তিষ্ক আপনার বিশ্বাসের দায়ে’ই আপনাকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া রেসপন্স হিসেবে ফিডব্যাক দিবে।
• আস্থা : আমাদের মস্তিষ্ক সর্বদাই স্থিতিস্থাপকতা খুঁজে ফিরে তাই যে বিষয়ে আপনার বিশ্বাস আছে সেটাকেই বেইজ করে চিন্তা চেতনার নিউরাল কানেকশন তৈরী হয়; সেইসব কানেকশন সময়ের সাথে সাথে এতোটাই গভীর ও প্রগাঢ় হয় যেন তা ডিনাই করলে আপন অস্তিত্বের অস্বীকার হয়। সুতরাং আপনার নিকট আপনার আস্থা’কে নির্ভরযোগ্য করতেই চাল পড়াতে মস্তিষ্কের রেসপন্স করতে হয় [যদি আদৌ চুরি করা হয়]।
• ভয় ও ভক্তি : আমাদের মস্তিষ্কের একটি বাই ডিফল্ট সিলেকশন ইউনিট হলো ভয় তথা ফেয়ার – যা হতে ভক্তির জন্ম নেয়। আপনি যখন কোন কিছুতে ভয় পান এবং সেটা সার্বজনীনভাবে মেনে নিতে হয় তখন মস্তিষ্কের ভয়ের অংশটি ভক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই ভয় ও ভক্তির স্বরূপ শুধু মস্তিষ্কের সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশনে সীমাবদ্ধ না থেকে সেটা শারিরীকভাবেও ফিডব্যাক রেসপন্স নিশ্চিত করে। যেমন চুরির ঘটনায় মানসিক ভয়ের দরূণ জাগ্রত হওয়া ফেনোমেনার সাথে ধর্মীয় ভক্তি সহযোগে এমন মানসিক অবস্থিতি তৈরী হয় যেন “চাউল পড়া” দ্রব্যটি মুখে নিতে সংকোচ ও দ্বিধায় নেগেটিভ ইনআরশিয়া তৈরী করে [চোরোর জন্য]।
• Somatoform Disorder : আমাদের মস্তিষ্কের Functional Neurological Symptom যা কিনা একটি নির্দিষ্ট ঘটনায় একই সময়ে একই মানসিকতার সকল ব্যক্তি সংক্রমিত হয়। এই যেমন কোন একটি বিষয়ে সকলেই “হ্যা” বলছে সেখানে আপনি বিষয়টা না বুঝেও যেহেতু সকলে “হ্যা” রেসপন্স করেছে তাই আপনার ফিডব্যাকও সকলের অনুরূপ হওয়ার প্রবণতা আরকি – যদিও এটা সামাজিকভাবে খুবই নরমালাইজেশন তথাপি এটা ডিজঅর্ডারের বিষয়েও ঐ একইভাবে ক্রিয়াশীল।
চুরি ও চাল পড়ার সাথে বিষয়টি এমনভাবে রিলেটেড যেন সবাই বিশ্বাস করে “ফু দেওয়া চাউল চোর খেতে পারবে না” ফলে চোরের মানসিকতাও সেইভাবে প্রভাবিত (ইনফ্লুয়েঞ্জ তথা প্রলুব্ধ) হয় – তখন আক্ষরিকভাবে চাল চিবাতে পারে না।
যাই হউক হিউম্যান ব্রেইনের এতোসব ব্যাকএন্ড সাইকোলজিক্যাল ক্যাচাল রেখে এখন সারফেস বর্ণনাতে যদি আসা হয় তাহলে চোর কেন চাল পড়া খেতে পারে না?
ফ্যাক্ট
(১) যিনি চুরি করেছেন তিনি অবশ্যই জানেন যে তিনি চোর – সুতরাং “চুরি করা বিষয়টা যে অন্যায়” সেই নেগেটিভিটি তার মানসিকতায় তার মন প্রভাবিত থাকে।
ডিপ্রেসিভ সিচুয়েশানে মস্তিষ্ক হতে Serotonin এবং Dopamine লেভেল হ্রাস পেয়ে Norepinephrine বৃদ্ধি পায় – এতে চোর আরও সজাগ ও সক্রিয় হয়ে ওঠে (অন্য আর সব সাধারণ মানুষ হতে); সুতরাং চোর নিজেই নিজেকে সবার মাঝ হতে অবচেতন মনে হাইলাইট করে ফেলে।
(২) এই যে অবচেতন হাইলাইট হয়ে যাওয়া – তখনই আবার মস্তিষ্ক নিজেকে নিরাপদ রাখতে Fight – Flight Response মোডে Cortisol ট্রিগার করে বসে; ফলে মানসিক অস্বস্তিতে মুখের লালা কমে যায়।
মুখ শুষ্ক হয়ে ওঠে যাতে চাল চিবানোর মতো মেন্টাল স্ট্যামিনা (ফোর্স) থাকে না; অপরাপর লালাতে যে Salivary Amylase চাল এর স্টার্চ Maltose (ডাইস্যাকারাইড) তে রূপান্তরে করা একদম হ্রাস পায়।
(৩) এই যে ইনিশিয়াল ল্যাকিংস শুরু হয় (চোর চাল চিবাতে পারছে না) সেটাই আবার ক্রনিক্যালি ঘটতে থাকে ফলে এবার তৈরী হয় তীব্র ভয়ে একরূপ জড়তা; ততোক্ষণে সকলেই ব্যক্তির ভয়ের হেতু তাকে ইতিমধ্যে চোর সাবস্ত্য করেই ফেলেছে।
(৪) সবিশেষ মানসিক অপরাধবোধে ঐ ব্যক্তির কথা জিহ্বার মাংসপেশী শিথিল হয়ে যায় এবং রক্ত প্রবাহে তারতম্য ঘটে – ফলে ব্যক্তিটির স্বীকার করা ভিন্ন আর কোন উপায়’ই থাকে না।
মাইন্ড হ্যাকিং
আচ্ছা এই “চাল পড়া খেয়ে চোর ধরা পড়া” বিষয়টি কি কোনভাবে সাইকোলজিক্যাল মাইন্ড হ্যাকিং হতে বাইপাস করা যায় না?
অবশ্যই যায় এবং সচরাচর এখনকার সময়ে এটি আগের মতো কাজ করে না কেননা আমরা মেন্টালি উপরের বিষয়গুলো শক্তভাবে হ্যান্ডেল করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি (এটা ক্রিমিনাল সাইকোলজির বিষয় – বিশদ আলোচনায় নাইবা গেলাম); ফলে তখন এটা দাড়ায় যে হয় চোর বাইরের কেউ নতুবা কামেল ব্যক্তির চাউল পড়া পাওয়া দুষ্কর!
যাই হউক – আপনি যদি চুরির পরেও মেন্টাল স্ট্যামিনা ঠিক রেখে বিষয়টাকে এজ ইউজিয়াল (খুবই স্বাভাবিক একটি কাজ) হিসেবে নিজেকে আত্মস্থ করাতে পারেন তখন আপনার জন্য হরমোন ইমিটিং কোন তারতম্য ঘটাবে না; ফলে সাইকোলজিক্যালি ও ফিজিক্যালি আপনি ইমপ্যাক্টিভ হবেন না; সুতরাং সহজেই চাল চিবিয়ে সামান্য উদরপূর্তি হবে বৈকি!
ওয়েট…আমি কি তাহলে সেইফ চুরি করার সুরক্ষা নিশ্চিত করছি?!
একদমই না; আমি হিউম্যান সাইকোলজির রুট বিষয়টার এক্সপ্লোর ও ইউটিলাইজেশান আপনার সামনে উপস্থাপন করছি মাত্র; তবে এই যে “আমার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে নিরাপদে চুরি শেখানো” সেটাই আসলে আমাদের মোরাল কানেক্টিভ স্টেইজ। এখন আপনার বা আমার মোরালিটি তথা নৈতিকতা যদি একটি কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাকে তখন সেটাকে ক্ল্যারিফাই করতেই হবে – ডার্ক সাইকোলজির জগতে আপনার আমার মস্তিষ্ক নিতান্তপক্ষে একটি জটিল ম্যাথ মাত্র; তাতে ফলাফল যেটাই আসুক আপেক্ষিকতা তো মানতেই হবে নাকি?!
OpenEye টেলিগ্রাম চ্যানেলে আমন্ত্রণ রইলো – মন চাইলে যুক্ত থাকতে পারেন 🙂
এনিওয়্যে ভালো থাকুন – শুভকামনা রইলো
