
“দিনরাত ২৪ ঘন্টা – দিন কাজের জন্য আর রাত ঘুমের জন্য” এমন সার্জনীন উক্তি যদিও আমরা বয়োজ্যেষ্ঠদের নিকট শুনি – তবুও অনেকাংশেই আমরা প্রায়শ রাত জাগি; শুধুই রাত জাগি তা নয় বরং অনেকেই সিংহভাগ কাজ জমিয়ে রাখেন দিনের শেষের দিক হতে মধ্য রাতের জন্য ফলে ঘুমাতে ঘুমাতে প্রায় ভোর আর ঘুম ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে দুপুর গড়ায়….
অগত্য এই বদ অভ্যাস’কে সঙ্গী করে নিয়ে আমাদের জীবনে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ভাঙ্গতে এক যন্ত্র চলে আসে “এলার্ম” এপ্লিকেশন।
শুধু বদ অভ্যাস’ই নয় বরং আরও নানাবিধ প্রয়োজনে পরিস্থিতি স্বাপেক্ষ নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম হতে জাগরণের জন্য এলার্ম সিস্টেম নিত্য জীবনের প্রয়োজনীয় এপ্লিকেশন হয়ে দাড়িয়েছে; আগেকার এলার্ম ক্লকের জায়গা দখল করেছে আমাদের মোবাইলের এলার্ম সফটওয়্যার।
আচ্ছা অর্নেস্টলি একটু ভাবুন তো “যখন ঘুম ভাঙ্গতে এলার্ম বাজে” তখন আপনার ঠিক কেমন লাগে?
যদি একান্তই আমার ভুল না হয় তবে সিংহভাগ মানুষই হয়তো এলার্মের আওয়াকে বিরক্ত হউন – কেউবা এলার্ম Snooze করে আরও ৫ মিনিট করতে করতে ঠিকই দুই ঘন্টা কাটিয়ে দেয় আবার কেউবা এলার্ম বন্ধ করে টানা ঘুমে দুপুরে উঠে পুরোই (ঐ দিনের ডেইলি রুটিন এর) ১২ টা বাজিয়ে দেন!
এনিওয়্যে এলার্ম কি কেউ আপনাকে জোর করে দিয়েছিলো নাকি আপনি অনিচ্ছায় দিয়েছিলেন?
মোটেই না…বরং আপনি তো আসলে খুবই সিরিয়াস হয়েও সকালে ঘুম হতে উঠার জন্য এলার্ম সেট করে প্রায় নিশ্চিন্ত মনেই ঘুমুতে গিয়েছেন – তাহলে ঠিক সমস্যাটা কোথায়?
মূলত ঘুম হচ্ছে কনশিয়াস মাইন্ড (সচেতন মন) হতে ফিজিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল রিলাক্সেশানের জন্য সাবকনশিয়াস মাইন্ড (অবচেতন মন) স্টেটে প্রবেশ যেখানে সারফেস আনকনশিয়াসনেস রিচ করে। সুতরাং যখন আপনি ঘুম হতে উঠছেন তখন আপনার মস্তিষ্ক এক প্রকার রিস্টার্ট হয় – যখন অচেতন মনের সারফেস লেভেল হতে সরাসরি কনশিয়াস মাইন্ড এ প্রবেশ করছেন; অথচ আপনার মস্তিষ্ক কিন্তু তখনও সাবকনশিয়াস স্তরে স্থিতিশীল থাকতে চাই [বিষয়টা এমন যেন এই তো…আর ইট্টুখানি ঘুমিয়ে নেওয়া যাক]!
সাইকোলজির ক্যাচাল রেখে যদি টেকনোলজির জানলা দিয়ে দেখি তাহলে এলার্ম ঘড়ি কিংবা ডিফল্ট এলার্ম এপ্লিকেশনের ক্রিং ক্রিং আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গানো খুব একটা প্রোডাক্টিভ বিবেচনা করা যায় না; একটি এলার্ম ঘড়ি বা এলার্ম এপ্লিকেশন কখনোই সাইকোলজিক্যালি ফোর্স করে আপনাকে সেভাবে ঘুম হতে জাগাতে পারে না – এরচেয়ও আরও ইফেক্টিভ ওয়্যে নিয়েই এই “একটি এলার্ম এপ্লিকেশনের গল্প”।
এমন একটি এলার্ম এপ্লিকেশন সিস্টেম তৈরী করা যেতে পারে যেখানে আপনি নির্দিষ্ট সময়ে এলার্ম সেট করলে সেখানে ততোক্ষণ অবধি বাজবে ঠিক যতোক্ষণ না পর্যন্ত আপনি Compulsory কিছু টাস্ক পূরণ করবেন – সেইসব Compulsory টাস্ক এমন হবে যেন ফোর্স’লি আপনি কনশিয়াস স্টেট (সচেতন মন) এ ফিরতে পারেন।
টাস্কসমূহ এমন হতে পারে:
(১) মোটামুটি জটিল সংখ্যার যোগ বিয়োগে অংক করতে হবে; যাতে সঠিক ফলাফল হতেই কেবলমাত্র এলার্মিং সাউন্ড বন্ধ হবে।
(২) মেমোরি কার্ড গেম (Memory Match): স্ক্রিনে ৫-১০ জোড়া কার্ড উল্টো করে দেওয়া থাকবে। আপনাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কার্ডগুলো উল্টে উল্টে একই জোড়া খুঁজে বের করতে হবে। এটি আপনার Light Memory (ঘুমের প্রচ্ছন্নতা) হতে স্মৃতিশক্তিকে সজাগ করে তুলতে ট্রিগার করবে।
(৩) টাইপিং চ্যালেঞ্জ (Transcription):
স্ক্রিনে একটি ছোট কিন্তু মোটিভেশনাল উদ্ধৃতি (Quote) বা এলোমেলো কিছু শব্দ দেখানো হবে। আপনাকে কোনো ভুল না করে হুবহু সেটি টাইপ করতে হবে। একটি ভুল হলেই আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।
(৪) কালার-টেক্সট কনফিউশন (Stroop Effect):
একটি রঙের নাম লেখা থাকবে (যেমন: ‘লাল’ লেখা), কিন্তু লেখাটির রং হবে অন্য (যেমন: নীল রঙে লেখা)। আপনাকে জিজ্ঞেস করা হবে “রঙটি কী?”। আপনাকে ‘নীল’ সিলেক্ট করতে হবে, ‘লাল’ নয়। এটি মস্তিষ্কের ফোকাস করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
(৫) ফিজিক্যাল কিউআর কোড স্ক্যান (QR Code Mission):
অ্যালার্ম বন্ধ করতে হলে আপনাকে বিছানা ছেড়ে উঠে আপনার বাড়ির নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় (যেমন: বাথরুম বা রান্নাঘর) রাখা একটি কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে।
(৬) অবজেক্ট ডিটেকশন (Image Recognition):
অ্যাপটি আপনাকে বলবে নির্দিষ্ট কোনো জিনিসের ছবি তুলতে (যেমন: “একটি মগ বা টুথব্রাশের ছবি তোলো”)। ফোনের ক্যামেরা দিয়ে সঠিক বস্তুটি শনাক্ত না করা পর্যন্ত অ্যালার্ম থামবে না।
(৭) ধাঁধা সমাধান (Pattern Sequence):
স্ক্রিনে কিছু প্যাটার্ন বা লাইট জ্বলে উঠবে। আপনাকে ঠিক সেই সিকোয়েন্স বা ক্রমে বাটনগুলো প্রেস করতে হবে। এটি মনোযোগ’কে (Concentration) কে ট্রিগার করে আপনার ঘুমের প্রচ্ছন্নতা কাটাতে বাধ্য করবে।
(৮) স্টেপ কাউন্ট (Step Tracker):
ফোনটি হাতে নিয়ে আপনাকে অন্তত ২০-৩০ কদম হাঁটতে হবে। ফোনের সেন্সর দিয়ে স্টেপ কাউন্ট পূর্ণ হলে তবেই অ্যালার্ম রিং বন্ধ হবে।
(৯) শেক টু স্টপ (Intense Shaking):
আপনাকে ফোনটি খুব দ্রুত এবং নির্দিষ্ট সময় ধরে (যেমন: ৩০ সেকেন্ড) ঝাকাতে হবে। এটি আপনার হাতের পেশি এবং রক্ত সঞ্চালন সচল করবে।
(১০) ভয়েস কমান্ড বা রিডিং (Read Out Loud):
স্ক্রিনে থাকা একটি বাক্য আপনাকে জোরে পরিষ্কারভাবে পড়তে হবে। ফোনের মাইক্রোফোন সেটি শুনে সঠিক শনাক্ত করলে তবেই আপনি মুক্তি পাবেন।
(১১) লজিক্যাল রিঅ্যারেঞ্জমেন্ট (Sentence Scramble):
একটি বাক্যের শব্দগুলো এলোমেলো করে দেওয়া থাকবে। আপনাকে দ্রুত শব্দগুলো সাজিয়ে একটি অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরি করতে হবে।
উপরোক্ত এই সকল বিষয়গুলোর ম্যাথমেটিক্যাল টার্ম, টাইপিং, শেকিং (ট্যাপিং), কালার সিলেকশন ফ্যাক্টসমূহ দ্বারা এমন ওয়েব এলার্ম এপ্লিকেশনের প্রোটোটাইপ মডেল :- https://humayunshariarhimu.github.io/CrazyAlarm/
[গিটহাবে ওপেন রিপোজিটরী রইলো – আপনি আপনার প্রয়োজন মতো মোডিফাই করতে পারেন]।
তদুপরি একটি ওয়েব এপ্লিকেশনের মাধ্যমে আসলে এই সকল বিষয়গুলো ইমপ্লিমেন্ট করা যায় না; যার জন্য প্রয়োজন হবে কমপ্লিট এনড্রোয়েড এপ্লিকেশন।
এমনই এনড্রোয়েড এপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টের লজিক বেইজ রুট কোড শেয়ার করছি : https://github.com/HumayunShariarHimu/CrazyAlarm/tree/main/App
সাইকোলজিক্যাল কিছু কথা:-
আমরা যখন ঘুম হতে উঠি তখন আমাদের মস্তিষ্ক খুবই সেনসেটিভ অবস্থাতে থাকে; ঠিক যেমন ঘুম হতে উঠতে রাতে যদি একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখে থাকি – তাহলে মনটা খুব আনন্দে উৎফুল্ল থাকে। দুঃখজনক কোন স্বপ্ন দেখলে একটু ভয় কিংবা দুঃশ্চিতা কাজ করে – অবার কেউ যদি ডিস্টার্ব করে ঘুম ভাঙ্গায় তাহলে রাগান্বিত মানসিকতা থাকে…
আমাদের মস্তিষ্কের এই সূক্ষ সেনসেটিভিটির বিষয়টাকে ইমপ্লিমেন্ট করে আদৌ কি আমরা ন্যাচারাল লাইফে সাকসেস ও স্যাটিসফেকশান গেইন হবে এমন কিছু করতে পারি?
খুব সম্ভাবত পারি – মস্তিষ্কের এই Hypnopompic State -তে আমরা মেডিটেটিভ ভাইবে পজেটিভ ইনপুট দিতে পারি।
বিষয়টা কেবলই মোটিভেশানাল বাক্য কিংবা সাইকোলজিক্যাল সাজেশন হবে এমনটা নয় বরং আপনার ঘুমটাই ভাঙ্গবে ঐ “মেডিটেটিভ ভাইবে পজেটিভ সেনসেশানারী ইনপুট” এর কারনে। একটু সহজভাবে যদি বলতে হয় তাহলে “আপনার জীবনের লক্ষ্য বা স্বপ্ন পূরণের বিষয়টাকে কার্যকরী এলার্ম আকারে সেট করা – যেন ঐ বিষয়টিই Cognitive Reframing হয়ে আপনাকে নিয়ত ট্রিগারিং করে”। আবার বিষয়টা যখন দিনের পর দিন প্রত্যহ ঘটবে তাই সেটা আবশ্যিকভাবে কগনিটিভ আকারে আপনার জীবনে প্রতিফলিত হতে বাধ্য – সুতরাং লজিক্যালি সফল হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই বাড়বে।
এটলিস্ট ক্রিং ক্রিং কর্কশ আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গার তো তো কোন মানেই হয়না….
এনিওয়্যে ভালো থাকুন, শুভকামনা রইলো।
টেলিগ্রাম আমন্ত্রণ রইলো :- OpenEye
আপনার সুন্দর জীবনের জন্য নিরন্তর শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইলো।
